হতাশায় লকডাউনে বেকার হয়ে পড়া পরিবহন শ্রমিকেরা।

প্রচণ্ড দাবদাহে মানিকগঞ্জ বাস টার্মিনালের যাত্রী ছাউনির নিচে জটলা পাকিয়ে বসে আছেন বেশ কয়েকজন। প্রত্যেকের চোখে–মুখে দুশ্চিন্তা আর হতাশা। সামাজিক দূরত্ব না থাকলেও তাঁদের প্রত্যেকের মুখে ছিল মাস্ক।

গতকাল বুধবার দুপুরে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা সবাই পরিবহনশ্রমিক। কেউ বাস চালান, কেউ চালকের সহকারী (হেলপার)। লকডাউনে সহায়তা করার জন্য পরিবহনসংশ্লিষ্ট নেতারা পরিবহনশ্রমিকদের তালিকা করছেন। খবর শুনে সেই তালিকায় নাম লেখাতে তাঁদের সবাই জড়ো হয়েছেন সেখানে।

ছবি তোলার সময় চল্লিশোর্ধ্ব বয়সী গোলাপ খান এগিয়ে এলেন। জেলার ঘিওর উপজেলার কেল্লাই গ্রামের বাসিন্দা বাসচালকের সহকারীর কাজ করতেন। লকডাউনের কারণে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় এখন বেকার তিনি। তিন সন্তানের সবাই পড়ালেখা করে। বড় ছেলে আলামিন হোসেন একাদশ ও ছোট ছেলে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছোট মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। বাড়িতে স্ত্রী আছেন। গোলাপ খান বলেন, ‘১৫-১৬ দিন ধইর‌্যা লকডাউনে গাড়ি চালানো বন্ধ। হাতে টাকাপয়সা নাই। ঘরে থাকা চাল-ডাল যা আছিল সপ্তাহখানেক চলছে। এরপর থেইক্যা ধারদেনা করে বাজারসদাই করছি। এহন তো আর পারতাছি না।’

তাঁর কথা শেষ না হতেই পাশে এসে কথা বলতে শুরু করেন বাসচালক মো. জুয়েল (৩০)। জেলা সদরের মেঘশিমুল গ্রামে স্ত্রী, শিশুসন্তান ও বৃদ্ধ মা–বাবাকে নিয়ে তাঁর সংসার। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় শুভযাত্রা পরিবহনের এই বাসচালকও বেকার হয়ে পড়েছেন। কষ্ট আর হতাশার স্বরে জুয়েল বলেন, চার মাসের মেয়ের জন্য প্রতিদিন দুধ কিনতে হয়। ঘরে স্ত্রী ও বৃদ্ধ মা–বাবা। তাঁদের মুখে দুই বেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়। ভীষণ কষ্টে কাটছে দিন।

জেলা বাস মালিক সমিতি জানায়, মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকা চলাচলকারী ও জেলার অভ্যন্তরীণ রুটে প্রায় দুই হাজার বাস চলাচল করে। এসব পরিবহনে কমপক্ষে ছয় হাজার শ্রমিক নিয়োজিত আছেন। এসব পরিবহন বন্ধ থাকায় চরম দৈন্যদশার মধ্যে পড়েছেন তাঁরা।

শ্রমিক বা মালিকদের সহায়তায় সরকারি কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি বলে জানান জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঈদের আগে শ্রমিকদের খাদ্যসহায়তা দিতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য তালিকা করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক এস এম ফেরদৌস বলেন, নির্দিষ্ট করে পরিবহনশ্রমিকদের জন্য সরকারি কোনো বরাদ্দ দেওয়ার নির্দেশনা পাননি। তবে দরিদ্র মানুষের মধ্যে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এই সংকটকালে পরিবহনশ্রমিকদের পাশে পরিবহনমালিক ও শ্রমিক সমিতির নেতাদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে।

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার সূর্যমণি ইউনিয়নে চাঁদার দাবিতে চারটি ঘরে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ২৪ মার্চ থেকে ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ওই চার পরিবারের সদস্যরা। উপজেলার সূর্যমণি ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আনিচ হাওলাদার (৩৫) ও তাঁর বাহিনীর বিরুদ্ধে ওই চার ঘরে তালা লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আনিচের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। রয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। তবু বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। তাঁর বাহিনীর আতঙ্কে কেউ প্রতিবাদ করতে পারছে না।

সূর্যমণি ইউনিয়নের ইন্দ্রকূল গ্রামের বাসিন্দা হামিদা বেগম (৭০) অভিযোগ করে বলেন, তিনি সম্প্রতি বসবাসের জন্য পাকা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন। খবর পেয়ে গত ২৪ মার্চ আনিচ ও তাঁর বাহিনীর সদস্যরা গিয়ে তাঁর (হামিদা) কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। তিনি টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় তাঁর বসতঘরে আনিচ তালা লাগিয়ে দেন। সেই থেকে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, আনিচের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও অদৃশ্য কারণে পুলিশ গ্রেপ্তার করছে না। এ বিষয়ে তিনি পুলিশ সুপার বরাবর আবেদনও করেছেন।

মাহাবুব আকন (৫০) নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, তাঁর কাছে বিভিন্ন সময় আনিচ ও তাঁর ভগ্নিপতি সূর্যমণি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন চাঁদা দাবি করেন। ২৩ মার্চ রাত সাড়ে ১১টার দিকে আনিচ বাহিনী তাঁর ঘরে ঢুকে তাঁকে মারধর শুরু করেন এবং নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করেন। ওই সময় তাঁর ছেলে মো. আসিফ (১৬) প্রতিবাদ করলে তাকে আনিচ বাহিনী তুলে নিয়ে যায় এবং রাত সোয়া তিনটা পর্যন্ত তাঁর ছেলেকে আটকে কয়েক দফায় লোহার রড দিয়ে অমানবিক নির্যাতন করে। এ ঘটনায় তিনি ৪ এপ্রিল পটুয়াখালী আদালতে আটজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। ওই মামলায় আদালত সব আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

মাহাবুব আরও বলেন, তিনি তাঁদের (আনিচ ও তাঁর বাহিনী) হুমকি ও ভয়ে এলাকায় যেতে পারছেন না। অথচ আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পুলিশ দেখেও না দেখার ভান করছে।

এদিকে আনিচ বাহিনীর অন্যায় ও অত্যাচারের প্রতিবাদ করায় এক আইনজীবীর ঘরে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি এলাকায় যেতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন পটুয়াখালী জজ আদালতের আইনজীবী মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।

তবে আনিচ হাওলাদার বলেন, ‘আমার কোনো বাহিনী নেই। যাঁরা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তাঁরা ও তাঁদের স্বজনেরা আমার ঘরে চুরি করেছেন। এখন আমার বিরুদ্ধে তাঁরা মিথ্যা অভিযোগ করছেন।’

এ ব্যাপারে সূর্যমণি ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এসব অভিযোগ সত্য নয়। আমি কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিই না। একটি মহল আমার ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

মোঃ মাহফুজ মিয়া

মোঃ মাহফুজ মিয়া বাংলাদেশের অন্যতম শিক্ষা বিষয়ক ওয়েবসাইট পড়ালেখা ২৪.কম এর প্রতিষ্ঠাতা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

Back to top button