মোবাইলে আসক্ত শিশু-কিশোররা খেলার মাঠে আগ্রহ নেই।

দুপুর গড়িয়ে এসেছে বিকেল, বেজেছে স্কুল-কলেজে ছুটির ঘণ্টা। এরপর বাড়ি ফিরে কিছু খেয়েই একদৌড়ে মাঠে। সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত সেখানে বিভিন্ন খেলায় মগ্ন থাকতো শিশু-কিশোররা। তবে সেদিন যেন ফুরিয়ে এসেছে এ করোনাকালে। এখন বাসায় বসে মোবাইলে গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে তারা।

জানা যায়, গ্রামাঞ্চলের মাঠগুলো এখন যেন গবাদি পশুর চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। মাঠে নয়, শিশু-কিশোরদের এখন দেখা যায় রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকানে বা কোনো নির্জনস্থানে। এদের মধ্যে অনেকেই সঙ্গদোষে তলিয়ে যাচ্ছেন মাদকের দুনিয়ায়। এতে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। তবে এর থেকেও বড় আকারে দেখা দিয়েছে স্মার্টফোন আসক্তি। এ আসক্তি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠছে তাদের মনের বিকাশে ও চরিত্র গঠনে।

প্রায় সবার হাতেই শোভা পাচ্ছে স্মার্টফোন।এছাড়া আগে গ্রামে বিভিন্ন ধরনের টুর্নামেন্ট হতো, যাতে নিজ গ্রামের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করত কিশোররা। টুর্নামেন্টে দলের শক্তি বাড়াতে জেলা, বিভাগ বা রাজধানী শহরের নামিদামি বিভিন্ন ক্লাব আর অ্যাকাডেমি থেকে খেলোয়াড় ভাড়া করেও আনা হতো। আর থাকতো গ্রামের খেলোয়াড়রা। তবে এখন চিত্র পুরোপুরি উল্টো। টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে অংশ নেয়া দলগুলো ভাড়ার খেলোয়াড় দিয়েই একাদশ সাজায়।

গ্রাম বা মহল্লার খেলোয়াড় থাকে মাত্র দুই-একজন। কারণ গ্রামের কিশোরদের নেই খেলায় তেমন আগ্রহ। এতে তৈরি হচ্ছে না ভালো খেলোয়াড়। ঝালকাঠি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আল মামুন খান ধলু বলেন, ‘গ্রামে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আগের মতো নেই। মাঠপর্যায়ে তেমন সংগঠকও নেই। পৃষ্ঠপোষকতাও মিলছে না সেভাবে। খেলাধুলায় শিশু-কিশোরদের বিকাশে এটা বিরাট অন্তরায়। দায় পরিবারেরও রয়েছে।

সন্তানের হাতে যদি ফুটবল, ব্যাট তুলে দেয়া না হয়, মাঠে পাঠানোর তাগিদ না দেয়া হয়, তাহলে তো তারা ঘরে বিভিন্ন ডিভাইস নিয়েই সময় কাটাবে।’ এদিকে মোবাইলে আসক্তি বেড়ে যাওয়ায় শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।শিশু-কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. অসীম কুমার সাহা বলেন, ‘একটি শিশু মস্তিষ্কের যে অংশটা যে দিকে খাটাবে, ওই অংশটাই কেবল বিকশিত হবে। বাকি অংশগুলো আর বিকশিত হয় না। তাদের ক্ষেত্রেও এমন হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন লক্ষণ দেখা যায়, ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসে আসক্তির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা দেখা যাচ্ছে।

তাদের বিকাশ ঠিকভাবে হচ্ছে না। স্বাভাবিক জীবনযাপনে এটা বড় অন্তরায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ছেলেমেয়েরা দীর্ঘদিন ধরে আবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন ডিভাইস দখল করে নিয়েছে খেলাধুলার স্থান। আগে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক খেলাধুলার আয়োজন করা হতো, এখন সেগুলোও বন্ধ। শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিতে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে বলার কিছু নেই।

তাই সবারই এক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেয়া দরকার।’ আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, ‘কয়েক বছর ধরেই শিশু-কিশোরদের অনলাইন নির্ভরতা বাড়ছে। করোনার সময় এটি আরও বেড়েছে। আসক্ত শিশু-কিশোররা কল্পনায় একটি কৃত্রিম জগৎ তৈরি করে নিয়েছে। হতাশা গ্রাস করছে তাদের। কোভিড পরিস্থিতে অভিভাবকরা সন্তানদের মাসের পর মাস চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থা দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয় এড়ানো কঠিন হবে।’

Mahfuz Mia

মাহফুজ মিয়া বাংলাদেশের অন্যতম শিক্ষা বিষয়ক ওয়েবসাইট পড়ালেখা ২৪.কম এর প্রতিষ্ঠাতা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

Back to top button